
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে হাইল হাওরের মাছের অভয়াশ্রম বাইক্কাবিল এখন পাখির কলতানে মুখর। প্রতি বছরই পরিযায়ী পাখিরা শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে একটু উষ্ণতার জন্য এ বিলে ছুটে আসে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায় পাখির আগমন। আবার শীতের শেষে চলে যায় আপন নীড়ে। এ বছর বাইক্কাবিলে ৩৮ প্রজাতির ৭৮৭০টি জলচর পাখি এসেছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে ৭৫০টি মেটেমাথা টিটি, ৬৩৯টি কাস্তেচরা, ১০০টি রঙিলা কাস্তেচরা এবং কালামাথা কাস্তেচরা। তবে গত দুই বছরের তুলনায় এ বছর পাখির আগমন বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে ৩৩ প্রজাতির ৪৬১৫ জলচর পাখি এসেছিল। আর ২০২৩ সালে এসেছিল ৪০ প্রজাতির ৬১৪১ পাখি।
এশিয়ান ওয়াটার বার্ড সেনসাসের অধীনে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের পরিচালনায় বাইক্কাবিলে টেলিস্কোপ দিয়ে পাখিগণনা করে গত শনিবার রাতে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান পাখিবিশেষজ্ঞ ড. পল থম্পসন।
জানা যায়, ২০০৩ সালে সরকার বাইক্কাবিলকে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণ করে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পশু ও মৎস্য সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্ট স্টাডিজ (সিএনআরএস)-এর যৌথ ব্যবস্থাপনায় হাইল হাওরের বাইক্কাবিল পরিচালিত হচ্ছে।
বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বড় গাঙ্গিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংগঠন’। হাইল হাওরের ১২৫ একর চাপরা, মাগুরা, যাদুরিয়া বিল এবং জলাশয় ও বাইক্কা বিল মিলে প্রায় ৩০০ একর এলাকা মুখরিত অতিথি পাখিদের কলতানে।
বিলে আসা উল্লেখযোগ্য পাখির মধ্যে রয়েছে সাদা বক, খয়রা কাস্তেচড়া, বেগুনিকালেম, পাতিসরালি, পানকৌড়ি, ঈগল, ধূসর বক, তিলা লালপা, ছোট ডুবুরি, রাজ সরালি, সরালি, বালিহাঁস, পাতি তিলি হাঁস, মরচে রং ভুতি হাঁস, গিরিয়া হাঁস, পিয়ং হাঁস, গয়ার বা সাপপাখি, পাতিকুট, পাতি পানমুরগি, কানিবক, ডাহুক, বিল বাটান, গেওয়ালা বাটান, কালাপাখ ঠেঙি, লাল লতিকা টিটি, মেটেমাথা-টিটি। সঙ্গে রয়েছে আমাদের দেশি পাখি। পাখিদের খুনসুটি, ডুব-সাঁতার, ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে চলা হাওরজুড়ে সৃষ্টি করেছে নান্দনিক সৌন্দর্য।
আর এসব দৃশ্য দেখতে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক ও পাখিপিপাসুরা আসছেন হাইল হাওরে। হাওরের নীল জলে পাখিদের জলকেলি আর নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে পর্যটকদের জন্য সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। এই টাওয়ারে বসে পর্যটকরা বাইনোকুলার ও টেলিস্কোপ দিয়ে খুব সহজেই হাইল হাওরের প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করেন। নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ান হাওরে। তখন পর্যটকরা খুব কাছে থেকে পাখিদের দেখতে পান। পাখির নাম-পরিচয় জানতে বিলে একটি ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার রয়েছে।
এই সেন্টারে রয়েছে তথ্য কেন্দ্র, অ্যাকুরিয়াম ও ডিসপ্লে বোর্ড। পাখিবিশেষজ্ঞ ড. পল থম্পসন বলেন, জলাভূমির সূচক অনুযায়ী শুধু জলচর পাখিকেই এ গণনার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরিযায়ী পাখির সংখ্যা নির্ভর করে জলস্তর, আগের মৌসুমের পরিস্থিতি এবং পরিযায়ন পথের ওপর। এই বিলে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা গড়ে ৫৯ শতাংশ। বিলের অভয়ারণ্য, আরএমও, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সুরক্ষার ওপর পাখির সংখ্যা নির্ভর করে। বাইক্কাবিল রক্ষণাবেক্ষণ দায়িত্বে থাকা স্থানীয় বড়গাঙ্গিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মিন্নত আলী বলেন, পাখিরা বিলের কচুরিপানা ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদের ওপরেই বেশি থাকে।
বিলের কিছু অংশে শাপলা-পদ্ম টিকে থাকলেও জলজ উদ্ভিদ কমে গেছে। বিলে মাছ শিকারি ও পর্যটকরা নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কারণে পাখিদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে।
ফটোগ্রাফার খোকন থৌনাউজাম বলেন, এবার খয়রা কাস্তেচরা বেশি এসেছে। এদের ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা গেছে। অন্য পাখিও এসেছে। হাঁস প্রজাতি একটু কম এসেছে মনে হয়েছে। সিএনআরএসের সাইড কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, এ বছর প্রচুর পাখি এসেছে। পাখিদের নিরাপত্তায় বিলে সার্বক্ষণিক পাঁচজন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। তবে এই সংখ্যা বিলের আয়তনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো. মতিউর রহমান
মোবাইল : ০১৭১০-৯০৪৮৬০
Copyright © 2026 দৈনিক প্রথম সিলেট. All rights reserved.