শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক পদ থেকে আব্যাহতিপ্রাপ্ত মো. তাজ উদ্দিন (তাজু) বলেছেন, 'দলীয় সিদ্ধান্ত ও পাওনা টাকা নিয়ে সংসদ সদস্য হাজি মুজিবুর রহমান চৌধুরীর সাথে মতবিরোধ থাকার কারনে সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতে আমাকে উপজেলা বিএনপির পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।'
সংসদ সদস্যকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'এক ব্যাক্তির একক সিদ্ধান্তে মিথ্যা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অজুহাতে আমাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।'
এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১২ টায় স্থানীয় একটি রেষ্টুরেন্টে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন উপজেলা বিএনপির সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত যুগ্ম আহবায়ক ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তাজ উদ্দিন তাজু।
তিনি বলেন, 'গত ১৩ আগস্ট আমাকে বাদ দিয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির একটি সভা হয়। ওই সভায় আমাকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য জেলা বিএনপির কাছে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মিটিং শেষে উপজেলা বিএনপির কয়েকজন সদস্য বিষয়টি আমাকে জানান। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জনাব নুরুল আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান উনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই রেজুলেশন পাশ করা হয়েছে এবং কাউকে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। নুরুল আলম সিদ্দিকী আক্ষেপ করে বলেছিলেন -যা হচ্ছে এগুলো ঠিক হচ্ছে না, এভাবে চলতে থাকলে দলের অস্থিত্ব সংকটে পড়বে।'
তাজু আরো বলেন, গত ১৬ আগস্ট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফয়জুল করিম ময়ূন এবং সদস্য সচিব জনাব আব্দুর রহিম রিপন স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে আমাকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অথচ অব্যাহতি দেওয়ার আগে আমাকে কোনো শো'কজ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি। আমার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে, তাও আমাকে জানানো হয়নি। কোনো অভিযোগের বিষয়ে আমার বক্তব্য নেওয়া হয়নি। সাংগঠনিক শুনানিতে আমাকে ডাকা হয়নি। গণমাধ্যম ও দলীয় সূত্রের মাধ্যমে আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমার বিরুদ্ধে নাকি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে অথচ বিগত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে আমাকে দলীয় কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখা হয়েছে যা আমি বিভিন্ন সময় জেলা বিএনপি ও সিলেট বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক জনাব মিফতা সিদ্দিকী সাহেবকে অবগত করেছি।'
তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত আমি ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা মৌলভীবাজার -৪ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সাংগঠনিক বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছি । নির্বাচনের ২-৩ সপ্তাহ পূর্বে দলীয় কিছু বিষয় ও আমার ব্যক্তিগত আর্থিক দেনা-পাওনা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। এরপর থেকেই আমাকে বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা হয়। এ বিষয়টিও আমি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক সহ কয়েকজন গিয়ে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবকে অবগত করেছি।'
সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির এই নেতা বলেন, '২০০৬ সালে প্রবীণ নেতা মরহুম এম এ সাইফুর রহমানের হাত ধরে বিএনপিতে যোগ দেই। দলের আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে দলীয় সকল আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সাংগঠনিক কর্মকান্ড সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছি। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় আমি শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছি। এর মধ্যে ২বারের সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বশেষ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। দলের দুঃসময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে আমাকে বহু মামলা, হামলা ও কারাবরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ৫ জানুয়ারী ২০০৯ থেকে ৫ আগষ্ট ২০২৪ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে ৩০টির অধিক মিথ্যা ও গায়েবী মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৭শ' ২০ দিন কারাবরণ করেছি। পরিবারের সদস্যরাও একাধিক মামলার শিকার হতে হয়েছে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি দল থেকে বিচ্যুত হইনি এবং কোনো ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য দলের আদর্শের সঙ্গে আপস করিনি। ২০১৮ সালের ৫ জানুয়ারী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিলেট আগমন উপলক্ষ্যে শ্রীমঙ্গলে স্বাগত মিছিল বের করলে পুলিশ হামলা করে, নেতাকর্মীদের সাথে আমাকেও গ্রেফতার করে। নির্যাতন করে পা ভেঙ্গে দেয়। পরবর্তীতে জেল হাজতে থেকে সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালের প্রিজন সেলে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এসব কর্মসূচিতে বর্তমান সাংসদ সাথে ছিলেন। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দলের জন্য কাজ করেছি। দলের জন্য আমার ত্যাগ, আন্দোলন সংগ্রাম বিবেচনা করে দল আমাকে সর্বশেষ যুগ্ম আহ্বায়ক পদ দিয়ে মূল্যায়ন করে।
তাজ উদ্দিন তাজু বলেন, সংসদ নির্বাচনে পাস করার পর সংসদ সদস্য দলের ত্যাগী, নির্যাতিত নেতাকর্মীদের অবমূলয়ান করা হচ্ছে। দল থেকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে পবিত্র রমজান মাসের ইফতার মাহফিলে যারা হামলা- মামলা করেছে, নির্যাতন করেছে সেই আওয়ামী দোসররা আজ সংসদ সদস্যের চারপাশে ঘিরে রেখেছে।'
সাংবাদিক সম্মেলনে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে দলীয় কাউন্সিল ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ছাড়া পকেট কমিটি করার কোন চেষ্টা হচ্ছে। কারো ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ বা ব্যক্তিগত বিরোধের প্রভাবে ইচ্ছে মাফিক পকেটে কমিটি করা হলে নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানা তাজু।
সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম আহবায়ক এর পদ থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্তকে অন্যায় ও অগঠনতান্ত্রিক উল্লখ করে তিনি জেলার এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবী জানান।
জানতে চাইলে সংসদ সদস্য হাজি মুজিবুর রহমান চৌধুরীকে ফোন দেয়া হলে তার পিএস জানান, তিনি রাস্ট্রপতি নির্বাচন কাজে সংসদে ব্যস্ত আছেন।
যোগাযোগ করা হলে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক নুরে আলম সিদ্দিকী এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো. মতিউর রহমান
মোবাইল : ০১৭১০-৯০৪৮৬০
Copyright © 2026 দৈনিক প্রথম সিলেট. All rights reserved.