হবিগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী জনপদ বানিয়াচং—এই শান্ত মাটির বুকে জন্ম নিয়েছিলেন এক মানুষ, যিনি কলমকে করেছেন ঐতিহ্যের কণ্ঠস্বর, গবেষণাকে করেছেন ভালোবাসার অনুশাসন, আর সংস্কৃতিকে ছুঁয়ে দিয়েছেন প্রাণের উষ্ণতায়। তিনি আবুসালেহ আহমদ—একজন লেখক, গবেষক, সংগঠক এবং লোকজ ইতিহাসের এক নিরলস সাধক।

১৯৬৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন তিনি বানিয়াচং উপজেলার শেখের মহল্লা গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই ছিল তাঁর অদম্য কৌতূহল, চিন্তার গভীরতা আর সৃজনশীলতার আলো। অষ্টম শ্রেণি থেকেই শুরু হয় তাঁর লেখালেখির যাত্রা, যা এখন এক দীর্ঘ চার দশকের ইতিহাস। তাঁর হাতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নতুন লেখক, নতুন সাহিত্য সংগঠন, এবং সংস্কৃতিমুখী তরুণ প্রজন্মের এক অনুপ্রেরণার ধারা।

আবুসালেহ আহমদ কেবল লেখক নন—তিনি এক মানুষপ্রেমিক গবেষক, যিনি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতিকে একত্রে বুনেছেন সাহিত্যিক ভাষায়। তাঁর কলমে ধরা পড়ে গ্রামের কৃষ্টি-কালচার, হারিয়ে যাওয়া লোকগাথা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, মানুষের হাসি-কান্না, ভালোবাসা আর সংগ্রাম।

বাংলা একাডেমির “লোক সংস্কৃতি সংগ্রহ মালা—হবিগঞ্জ” গ্রন্থের প্রায় ৮০ শতাংশ তথ্য সংগ্রহ করেছেন তিনি নিজ হাতে। বাংলা একাডেমি তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে একজন বিশিষ্ট সংগ্রাহক হিসেবে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শরদিন্দু ভট্টাচার্য তাঁর সম্পর্কে বলেছেন—
“একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে এতগুলো গ্রন্থ রচনা—বাংলাদেশে আবুসালেহ আহমদের মতো আর কাউকে আমি দেখিনি।”

১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “মোহের নিস্তব্ধ মোহনা”। তারপর একে একে প্রকাশ পায় “বানিয়াচংয়ের শত জন”, “ঐতিহাসিক বানিয়াচংয়ের ইতিহাস ও কিংবদন্তি”, “কাব্যে বানিয়াচংয়ের ইতিহাস”, “বানিয়াচংয়ের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা”, “ভবানীর প্রেম কাহিনী”, *“আলাল দুলালের কিচ্ছা বিশ্লেষণ”*সহ বহু আলোচিত গ্রন্থ।

লোকজ সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহ্য, গল্প, কবিতা, জীবনী ও গবেষণাধর্মী রচনাসহ তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা এখন প্রায় বিশটি। পাশাপাশি “মনন”, “প্রত্যয়”, “প্রত্যাশা”, “প্রতিশ্রুতি”, “জনপ্রবাদ”সহ বহু সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ করে তিনি গড়ে তুলেছেন নতুন প্রজন্মের লেখক সমাজ। বর্তমানে তিনি ইউএস বাংলা আন্তর্জাতিক সাহিত্য ফোরাম, সিলেট শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার—

জেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রথম পুরস্কার (১৯৮৯), শেরে বাংলা এ.কে.এম. ফজলুল হক পদক (২০১৬), রাগিব-রাবেয়া ফাউন্ডেশনের একুশের সম্মাননা (২০১৬), মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সম্মাননা (২০১৭), কবি কালাম আজাদ উৎসব স্বারক সম্মাননা (২০১৯), সার্জন টিভির গুণীজন সম্মাননা (২০২১) এবং ইউএস বাংলা আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের লেখক সম্মাননা (২০২২) সহ আরও বহু পুরস্কার তাঁর অর্জনের মুকুটে জ্বলজ্বল করছে।
মাছরাঙা টেলিভিশন, চ্যানেল এসসহ বিভিন্ন স্যাটেলাইট ও অনলাইন টিভি তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে নির্মাণ করেছে ডকুমেন্টারি। দেশের বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রবন্ধে ইতোমধ্যেই তাঁর জীবনী ও অবদান স্থান পেয়েছে গৌরবের সঙ্গে।
ব্যক্তিজীবনে আবুসালেহ আহমদ এক আদর্শ পরিবারপ্রেমী মানুষ। তাঁর জীবনসঙ্গী রোকশানা বেগম, দুই কন্যা সুমাইয়া নুসরাত তাম্মি ও ফাতেহা নুসরাত অমি, এবং পুত্র সাদমান সাকিব রাফি—এই পরিবারই তাঁর প্রেরণার উৎস। বর্তমানে তিনি সিলেটের আম্বরখানায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

আবুসালেহ আহমদ বিনয়ী, পরোপকারী ও ন্যায়নিষ্ঠ একজন মানুষ। নিজের সাফল্যের চেয়ে তিনি বেশি আনন্দ পান অন্যের সাফল্যে। তাঁর জীবন যেন এক চলমান প্রেরণার গল্প—যেখানে কলম, কাগজ আর মাটির গন্ধ মিলেমিশে তৈরি করেছে ভালোবাসার ইতিহাস।
তাঁর কলমে বানিয়াচং কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়—এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্যের নাম, এক অনন্ত ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।

তিনি যেন সময়ের সেই অমর কথক, যিনি ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখেন শব্দের উষ্ণতায়, আর প্রজন্মকে শেখান—
“নিজ মাটিকে ভালোবাসাই হলো সবচেয়ে বড় সাহিত্য।”