ভোরের আলোয় আলোকিত হওয়ার সাথে সাথে , কৃষক গোয়লঘরের দরজা খুলে কাঁধে লাঙল জোয়াল তুলে হালের গরু নিয়ে ছুটতেন কৃষি জমিতে। সেই দুপুর পর্যন্ত গরু দিয়ে হাল চাষ করতেন। জমির উর্বরতার জন্য জৈব সার হিসেবে প্রয়োগ করা হতো গরুর গোবর ,পচা কচুরিপানা ইত্যাদি। হালচাষ শেষে জমি পুরো তৈরি হলে কৃষক নিজে জমিতে ধান রোপন করতেন। ক্ষেতের জমি বেশি হলে সহযোগিতার জন্য দু’য়েকজন দিনমুজুর নিতেন।

জমিতে ধান রোপনের পর অতিমাত্রায় প্রয়োগ করতে হতোনা সার।জমিতে ধান পাকার পর , কৃষক এবং তার পরিবারের সকলে মিলে কেটে এনে গরু দিয়ে মাড়াই দিতেন। ধান মাড়াই নিয়ে চলতো নানা রকমের আনন্দ উল্লাস। কৃষক কৃষানির অক্লান্ত পরিশ্রমে গোলায় উটতো ধান। নিজের কষ্টে অর্জিত ফলন গোলায় তুলে শান্তির ডেকুর তুলতেন কৃষক মহল। এসব গল্প নব্বই দশকের। সেই সময়ে এক বিঘা জমি থেকে আশানুরুপ ফলন তুললেও কৃষকের টাকা খরচ হতো কম।

এখনকার সময় কৃষি হয়ে গেছে যান্ত্রিক নির্ভর। মানুষ গরু দিয়ে হালচায করেনা।কৃষক নিজে জমি রোপন করতে চায়না। ধান কাটা এবং মাড়াই দেয়া হয় মেশিনের সাহায্যে। অতিমাত্রায় সার প্রয়োগ করেও মিলেনা ভালো ফলন। জমি তৈরি থেকে শুরু করে ধান গোলায় তুলার আগ পর্যন্ত গুনতে হয় কাড়ি কাড়ি টাকা। টাকার অংক যোগ করে ,কৃষকের লাভের চেয়ে ক্ষতি হয় বেশি। টাকার হিসেব গুনতে গিয়ে অনেক কৃষক পিছিয়ে পড়ছেন কৃষি কর্ম থেকে।

যন্ত্রহীন কৃষিকাজে প্রতি বিঘা জমিতে সার ,কীটনাশক , দিনমুজুরের পারিশ্রমিক সহ খর্চ তুলনামূক অনেক কম হতো। এক বিঘা জমি থেকে ধান উত্তোলণ করা হতো ১০ থেকে ১২ মন। কৃষিক্ষেত্রে খরচ কম হওয়াতে মফস্বলের প্রায় প্রতিটি পরিবারই ছিলো কৃষি নির্ভর। সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে গেছে সেই অতিত ঐতিহ্য ।

এখন জমি তৈরি করতে ব্যবহার করা হয় ট্রাক্টর । এক বিঘা জমি তৈরি করতে হলে গুনতে হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা।এরপর টাকা দিয়ে রোপন করাতে হয় জমি । গোলায় ধান তুলার আগ পর্যন্ত প্রতিবিঘা জমিতে খর্চ হয় ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এতো টাকা খরচ করে জমিতে ভালো ফলন না হলে কৃষককে পথে বসতে হয়। আর ভালো হলে প্রতি বিঘাতে আমন ধান ১০-১২ মনের উপরে পাওয়া যায়না।

কখনো কখনো শুনা যায় সরকারিভাবে কৃষিখাতে ভুর্তুকি দেয়া হয়। এবং কৃষকদেরও সাহায্যে করা হয়ে থাকে। হলেও সেটা অপ্রতুল। অগ্রাহয়নের বাতাসে মাটের সোনালি ধান দুলছে। কারো আমনের ফলন ভালো হয়েছে , কারো মন্দ। যাহাই হয়েছে ব্যয়ের হিসেব কষে কৃষকদের মনে তেমন আনন্দ নেই। সেই অতিতে ফীরে যাওয়া সম্ভব নহে তবুও যদি খর্চ কম হতো তাহলে কৃষি থেকে মূখ না ফীরিয়ে সকল কৃষক হতেন কৃষি নির্ভর।