এক সময় আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের গ্রামীণ আড্ডার প্রাণকেন্দ্র ছিল হুক্কা, আজ প্রশাসনিক পরিবর্তন ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে গেছে সেই দৃশ্য।

এক সময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের উঠোন, চায়ের দোকান এবং মোড়ে দেখা যেত মুরব্বিদের আড্ডা। মাঝখানে থাকত হুক্কা—ধোঁয়ার ভাঁজে ভাঁজে চলত গল্প, জীবনের হিসাব, কৃষিকাজের আলোচনা এবং সামাজিক সংযোগ। আজ সেই দৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না।

এক সময় হুক্কা ছিল গ্রামীণ জীবনের পরিচিত দৃশ্য। ৯০ দশকে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে সন্ধ্যার পর হুক্কা ছাড়া আড্ডা অসম্পূর্ণই মনে হতো। হুক্কা শুধু ধূমপানের উপকরণ নয়, এটি ছিল সামাজিকতার প্রতীক।

একজন টান দিলে অন্যজন গল্প করত, অভিজ্ঞতা ভাগ করত। রাজনীতি, কৃষিকাজ, বন্যা এবং হাওরের মাছ ধরা সবকিছু উঠে আসত সেই আড্ডায়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আজমিরীগঞ্জেও এসেছে প্রশাসনিক ও সামাজিক পরিবর্তন। বর্তমানে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের পাশাপাশি একটি ইউনিয়নকে বিভক্ত করে গড়ে উঠেছে একটি পৌরসভা। প্রযুক্তি ও আধুনিক যোগাযোগের ছোঁয়ায় বদলে গেছে গ্রামীণ জীবনধারা। তবে এই পরিবর্তনের ভিড়ে হারিয়ে গেছে এক সময়ের চেনা দৃশ্য—হুক্কার ধোঁয়া।
আজ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা ঘুরলেও একটি হুক্কাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

কোথাও উঠোনে, কোথাও চায়ের দোকানে কিংবা গ্রামের মোড়ে আর দেখা যায় না সেই ধোঁয়া ওঠা দৃশ্য। প্রবীণরা আক্ষেপ করে বলেন, “হুক্কা টানতাম শুধু নেশার জন্য না। মানুষ একসঙ্গে বসত, গল্প করত। এখন সবাই ব্যস্ত, বসার মানুষই নেই।

কালের পরিবর্তনের কারণে হুক্কার ব্যবহার কমে যাওয়া অবশ্যই ইতিবাচক। তবে হুক্কার সঙ্গে যে আড্ডা, যে নির্ভেজাল সময় ভাগাভাগি তার অভাব গ্রামে এখন স্পষ্ট। নতুন প্রজন্ম সেই সংস্কৃতি জানে না, তাদের কাছে হুক্কা কেবল অতীতের গল্প।

আজমিরীগঞ্জে এখন আর হুক্কার ধোঁয়া ছাড়ে না, কিন্তু এটি বহন করে এক সময়ের গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি। যেখানে মানুষ সময় নিয়ে মানুষের পাশে বসত, গল্প করত এবং সম্পর্কগুলো ছিল ধোঁয়ার মতো ধীর ও গভীর। প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত বর্তমানের ভিড়ে হুক্কা হয়ে উঠেছে নীরব প্রতিক। হারিয়ে যাচ্ছে পুরনো দিনের স্মৃতি।

এলাকার শ্রমজীবি মানুষ ব্যবহার করত নারকেলের ভীতরের অংশ (টালি) এবং কাঠের বিশেষ অংশ দিয়ে তৈরি হুক্কা।
হাওরাঞ্চলে কৃষিজমিতর বসে কৃষক ও শ্রমিকরা কাজের ফাঁকে গড়গড় করে হুক্কা টানত। আর গাল ফুলিয়ে সাদা ধোঁয়া বের করত ধোঁয়ার ভাঁজে ভাঁজে ভেসে যেত দিনের ক্লান্তি, গল্প আর একেকটি স্মৃতি।

আজ সেই দৃশ্য কেবল স্মৃতিতে বেঁচে আছে। হুক্কার ধোঁয়া আর ওঠে না, তবে ধোঁয়ার মতোই গাঢ় ও ধীর সেই গ্রামীণ জীবনের গল্প এখনো মনে পড়ে, যা নতুন প্রজন্মের কাছে কেবল স্মৃতির।