সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সীমান্ত নদী ও বন বিভাগের সংরক্ষিত পাহাড়ি টিলা থেকে অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে বালু এবং সরকারি টিলা কেটে পাথর উত্তোলনের মহোৎসব থামানো যাচ্ছে না। প্রশাসনের একের পর এক অভিযান এবং সাম্প্রতিক সময়ে তিনটি মামলা দায়েরের পরও মাঠপর্যায়ে অবৈধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় সচেতন মহলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থার অভাব এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণেই পরিবেশের এই অপূরণীয় ক্ষতি ঠেকানো যাচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে বন বিভাগের প্রায় ৬ হাজার ২৪২ একর এবং খাস খতিয়ানভুক্ত প্রায় ১ হাজার একর সরকারি টিলা রয়েছে। এই বিশাল টিলাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট অবাধে মাটি কেটে পাথর উত্তোলন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের মাধ্যমে শত শত ঘনফুট লাল পাথর ও বালু উত্তোলন করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এর ফলে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের ওপর। পরিবেশ সংরক্ষণ, মাটি ক্ষয় রোধ ও স্থানীয়দের জীবিকার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে হাদা টিলার প্রায় ১৭৫ একর জমিতে এই সামাজিক বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বিচারে গাছ কেটে অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে প্রকল্পটি এখন ধ্বংসের মুখে। ইতোমধ্যে টিলার একটি বড় অংশ সমতলে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের দৃশ্যমান কিছু অভিযানের পর মামলার ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বলতা তৈরি হয়, তার সুযোগ নিচ্ছে মূল হোতারা।
গত ১ জুলাই সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোজাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ইসলামপুর ইউনিয়নের জামুরা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত চারটি কাঠের ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও একটি ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ছাতক সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা জুনেদ আহমদ বাদী হয়ে একটি মামলা (নং-৪৫/২০২৬) দায়ের করেন। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ ১৩ দিন তদন্ত শেষে নৌ-পুলিশ মামলার এজাহারে সিন্ডিকেটের মূল সদস্যদের নাম বাদ দিয়ে কেবল ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। এই রহস্যজনক নমনীয়তার কারণেই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে গত ১১ জুলাই ছাতক-দোয়ারাবাজার সীমান্তের মরা চেলা, কলাবাগান, কাজিরগাঁও ও সোনাপুর এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে দোয়ারাবাজার সদর ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের মরা চেলা নদীর খাস জায়গা থেকে কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলনের অভিযোগে কবির মিয়াসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। তবে এসকল মামলার পরও মাঠপর্যায়ে বালু লুটপাট বন্ধ হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুসসহ একাধিক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের কারণে আমাদের ফসলি জমি ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। আমরা বারবার প্রশাসনকে জানালেও মূল হোতাদের আড়াল করে রাখায় কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
টিলা ও বনাঞ্চলের গাছ কাটার বিষয়টি স্বীকার করে বন বিভাগের কর্মকর্তা ফেরদৌস বলেন, অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটটি স্থানীয় পর্যায়ে এতটাই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী যে, শুধু এককভাবে বন বিভাগের পক্ষে স্থায়ীভাবে তাদের দমন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোজাহিদুল ইসলাম জানান, আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ ড্রেজার ও নৌকা জব্দ করছি এবং আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে এই অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বিত, ধারাবাহিক ও অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহি উদ্দিন জানান, এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে ছাতক থানা, দোয়ারাবাজার থানা ও ফরেস্ট বিভাগের পক্ষ থেকে পৃথক পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান বজায় থাকবে।