সিলেট বিভাগের গ্রামীণ সড়ক পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়নে প্রায় ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে সিলেট নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা স্থায়ীভাবে নিরসনে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী শীত মৌসুম থেকেই জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ শুরু করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) কার্যক্রম ও কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সিলেট বিভাগের চার জেলার প্রতিটি উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন গ্রামীণ সড়ক পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়নের জন্য প্রায় ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু সিলেট জেলা নয়, পুরো বিভাগের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের অগ্রগতি হবে।

সিলেট নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি জলাবদ্ধতাকে নগরীর অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এ সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী শীত মৌসুম থেকেই প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নগরীর পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সিলেট নগরীতে মানুষের হাঁটার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। শহরের ‘ফুসফুস’ তৈরির লক্ষ্যে পুরাতন কারাগারের জায়গায় একটি পার্ক করার প্রচেষ্টা চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর পরিবেশ ও বায়ুর মানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, দেশে দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরমুখী হওয়ায় সীমিত জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিকল্পিত ও টেকসই নগর গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

তিনি বলেন, কৃষিজমি রক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি আবাসন চাহিদা পূরণ—সবগুলো বিষয় সমন্বয় করেই নগর পরিকল্পনা করতে হবে। এ জন্য জেলা ভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে।

জাকারিয়া তাহের বলেন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) মাধ্যমে সিলেটের উন্নয়নকে সুদূরপ্রসারী ও পরিকল্পিত রূপ দেওয়া হবে। পরিকল্পিত নগরায়নই হবে এ কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততার সঙ্গে নাগরিকদের সেবা দেওয়ার জন্য তিনি সিউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, কোনো নাগরিক যেন তার কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ বা অপরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার সুযোগ আর রাখা হবে না।

গৃহায়ণমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিকল্পিত নগরায়নের লক্ষ্যে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।

গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর বলেন, সিলেটে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। দেশের শহরগুলোকে ‘ক্লিন, গ্রিন ও স্মার্ট সিটি’তে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। সিলেটকেও দেশের অন্যতম উন্নত, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

সিলেটের মতো পর্যটননির্ভর একটি শহরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পনাহীনভাবে কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা শহরের জন্য সুফল বয়ে আনে না। তাই সিউককে সমন্বিত ও পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নাগরিকরা যেন সময়মতো সেবা পান এবং কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। সিলেটকে পরিকল্পিত, মানবিক ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে টেকসই উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে সিলেটের আবাসন সংকট সমাধান এবং প্রবাসীদের দখলকৃত ঘরবাড়ি উদ্ধারে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা কামনা করেন সংসদ সদস্যরা।

সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সুধী সমাবেশে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালেক, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মো. জিল্লুর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের পরিচালক মোহাম্মদ বদরুজ্জামান সেলিমসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সিউকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা উপলক্ষে মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর নাইওরপুল এলাকার হোটেল ফরচুন গার্ডেনে সংস্থাটির অস্থায়ী কার্যালয়ের উদ্বোধন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সিলেটের পরিকল্পিত নগরায়ন ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় নতুন এই কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলো।