
হাওর রক্ষা বাঁধের কাজের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়েছে গেল শুক্রবার। কিন্তু জামালগঞ্জে বাঁধ টেকসইকরণের কাজ অনেকাংশেই বাকি রয়ে গেছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারেও গ্রহণ করা হয় নি কোন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একাধিক ক্লোজারসহ বাঁধের নদী তীরবর্তী অংশে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যেই তল্পিতল্পা নিয়ে বাঁধ এলাকা ত্যাগ করেছে পিআইসির লোকজন।
হাওর পরিদর্শনকালে কিছু কিছু বাঁধে শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা গেছে। তবে অধিকাংশ বাঁধ ও ক্লোজারে রক্ষণাবেক্ষণের অনেক কাজ বাকি থাকলেও দেখা মেলে নি পিআইসিসহ শ্রমিকদের। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে এসেও অধিকাংশ বাঁধে লাগানো হয়নি দূর্বা, করা হয়নি দুরমুশ। এই অবস্থায় ত্রিশ ভাগ কাজ এখনও বাকী রয়েছে দাবী কৃষকদের।
সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষের দাবি জামালগঞ্জে ৯৩ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। তবে শুক্রবার দিনব্যাপী হালি, শনি ও মহালিয়া হাওর ঘুরে তেমনটা মনে হয়নি।
হাওর ঘুরে দেখা যায়, হালি হাওরের বদরপুর সংলগ্ন ঘনিয়ার বিল অংশের ২২ নম্বর পিআইসিভুক্ত ক্লোজারটি অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বাঁধের নদী তীরবর্তী অংশে ভয়ংকর ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধের নিরাপত্তায় এখন পর্যন্ত ফেলা হয়নি বস্তা, দেওয়া হয়নি বাঁশের আড়। ভয়ংকর ঝুঁকিতে থাকা এ বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে যুক্ত কাউকে বাঁধে পাওয়া যায়নি। ঠিক তার বিপরীত পারের শনির হাওর অংশের নান্টুখালি বাঁধের একাংশ নদীতে ধসে পড়তে দেখা গেছে।
এদিকে, শনির হাওরের স্লুইচ গেইট সংলগ্ন তিন নম্বর পিআইসিভুক্ত ক্লোজারটিও প্রায় অরক্ষিত। ভয়ংকর এ ক্লোজারে মাটি ফেলা শেষ হলেও বাকি আছে বাঁধ টেকসইয়ের সকল কাজ। ভরাট হয়নি বাঁধের গোড়ায় থাকা হাওরের ভেতরের অংশের গর্তটি। মাসদেড়েক আগে বাঁধসংলগ্ন তাঁবুতে গিয়ে পিআইসি ও শ্রমিকদের আশ্রয় নিতে দেখা গেলেও ইতিমধ্যে এ অস্থায়ী ডেরা ভেঙে তল্পিতল্পা নিয়ে চলে গেছে বাঁধ সংশ্লিষ্ট লোকজন। প্রায় ৩০ লাখ টাকার বরাদ্দকৃত এই বাঁধের ঝুঁকি এড়াতে অচিরেই কাজ করা হবে এমন আলামত চোখে পড়ে নি।
অপরদিকে, মহালিয়া হাওরের দুই বাঁধের পাঁচ নম্বর পিআইসিভুক্ত বাঁধে এখনও মাটি ফেলার কাজই শেষ হয় নি। এ হাওরের চার নম্বর বাঁধে দূর্বা—দুরমুশের কাজ করতে দেখা গেলেও পাঁচ নম্বর পিআইসির বাঁধে কাউকে পাওয়া যায় নি। হালি হাওরের মদনাকান্দি থেকে আছানপুর অংশের ১৭ নম্বর পিআইসির বাঁধে দূর্বা—দুরমুশের কোন কাজ এখনও করা হয় নি। আছানপুর থেকে হরিপুর পর্যন্ত ১৬ নম্বর পিআইসির কাজ চলমান আছে। হরিপুর থেকে সুন্দরপুর বিলের খলা পর্যন্ত ১৫ নম্বর পিআইসির কাজ সন্তোষজনক। তবে ১৪ নম্বর পিআইসিতে কেবল মাটি ফেলা হলেও আনুষাঙ্গিক সব কাজ বাকি আছে। সুন্দরপুর স্লুইচ গেইট থেকে উলুকান্দি—যতীন্দ্রপুর পর্যন্ত বাঁধের কাজেরও একই অবস্থা।
অন্যদিকে, হালির হাওরের ঝুনুপুর গ্রামের পার্শ্ববর্তী সাত নম্বর পিআইসিভুক্ত ক্লোজারের নদী তীরবর্তী অংশে ভয়ংকর ভাঙনের দেখা মিলেছে। চরম ঝুঁকিপূর্ণ এ ক্লোজারটির টেকসইকরণের কাজ বাকি আছে। এ বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অচিরেই বাঁশ—বস্তা দিয়ে ঝুঁকি এড়ানোর কথা থাকলেও আশেপাশে কোন সরঞ্জামাদি কিংবা পিআইসি সংশ্লিষ্ট কাউকে খেঁাজে পাওয়া যায় নি। একটু বৃষ্টি হলেই পুরো বাঁধ ধসে পড়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পতিত হবে হাওর। হাওর ঘুরে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক মনে হয়েছে।
ঘনিয়ার বিলসংলগ্ন ক্লোজারের নদী তীরবর্তী অংশে ভাঙ্গনের বিষয়টিতে সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষের দায় আছে জানিয়ে এক প্রত্যক্ষদর্শী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানিয়েছেন, যখন কাজ শুরু হয়, তখন উপজেলা প্রশাসন, পাউবো ও কাবিটা মনিটরিং কমিটির লোকজন বাঁধ পরিদর্শনে এসেছিলেন। তাদের পক্ষ থেকে ভাঙনের উপর অংশের বস্তি মাটি কেটে বাঁধে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় পিআইসিকে। এখান থেকে পুরোনো মাটি কেটে আনায় ভয়ংকর এই ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙন মেরামতে যদি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে হাওর বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে জানিয়েছেন তিনি।
২২ নম্বর পিআইসির সভাপতি মো. খোকন মিয়া বললেন, ভাঙন অংশ ২৩ নম্বর পিআইসির মনির উদ্দিন ভাইয়ের। ভাঙনের অংশ আমার পিআইসিভুক্ত না থাকলেও হাওরের সাথে সম্পৃক্ত বিধায় এর দায়ভার আমার উপরও বর্তায়। ভাঙনের বিষয়টি আমরা ইউএনও স্যারকে জানিয়েছি। তিনি বলেছেন, এর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে। পাশ হলেই পিআইসির মাধ্যমে কাজ করা হবে।
হালি হাওর পারের হাওড়িয়া আলীপুর গ্রামের (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এক কৃষক বললেন, ঘইন্যার বিলের (ঘনিয়ার বিল) ভাঙাটা খুব বিপজ্জনক। দিন দিন এই ভাঙন আরও বড় হইব (হচ্ছে)। তাড়াতাড়ি যদি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে আমরার লাগি বিপদ (আমাদের বিপদ হবে)। কৃষকের লাগিই (জন্য) এই বাঁধ দেওয়া হয়, যদি কৃষক বিপদে পড়ে তাহলে বাঁধ দিয়া লাভডা কিতা (বাঁধ দিয়ে লাভ কী)? হাওর থেকে ফিরে উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, হাওর এখনও শঙ্কামুক্ত নয়। নির্ধারিত সময় শেষেও বাঁধে অনেক কাজ বাকি আছে। এরমধ্যে মাটির কাজ প্রায় ১৫ ভাগ, দুরমুশের (মাটি ড্রেসিং) কাজ প্রায় ৪০ ভাগ এবং বাঁধে ঘাস লাগানোর কাজ বাকি আছে প্রায় সত্তর ভাগ।
পাগনা হাওরের ৩২ নম্বর পিআইসিভুক্ত ক্লোজারে এখনও মাটি ফেলা হচ্ছে। পাগনা হাওরের বৌগলাখালি, হালি হাওরের ঘনিয়ার বিলের ভাঙা, শনি হাওরের স্লুইচ গেইট সংলগ্ন ক্লোজারসহ বেশ কয়েকটি ক্লোজারে বাঁশ ও জিও বস্তা লাগানোসহ বাঁধ মজবুতের সব কাজই অবশিষ্ট আছে। ভারি বৃষ্টি হলে কৃষকের দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন পাউবো কর্মকর্তা তার পছন্দের লোক দিয়ে পি আই সি দিয়েছেন যারা কখনো বাদের কাজের অভিজ্ঞতা নাই, তিনি যে সকল পি আই সি দিয়েছেন সব গুলো পাইছেন এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নতুন তাই সঠিকভাবে তদন্ত করতে পারেন নাই কারণ জনি সাহেব যাদের নাম দিয়েছেন সেই গুলো দিয়ে দিছেন। এবং অনেক ই বলেন টাকার বিনিময়ে পি আই সি আনছি।
জামালগঞ্জে ৯৩ ভাগ কাজ হয়েছে জানিয়ে উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) শাখা কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জনি বলেন, মাটি ফেলার কাজ প্রায় শতভাগ শেষ হয়েছে। শুধুমাত্র মহালিয়া হাওরের একটি বাঁধে মাটি ফেলার কাজ বাকি আছে। যা আজকালের মধ্যেই শেষ হবে। এছাড়া ঘাস লাগানোর কাজও বাকি আছে। বাঁধের কাজের সময়সীমা আরও দশদিন বর্ধিত করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করা হবে।
ভাঙনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ভাঙনের বিষয়টি আমরা অবগত আছি। যদি ইমার্জেন্সি সিচুয়েশন মনে হয়, তাহলে আমরা জিও বস্তা ডাম্পিং করব। যেখানে ভাঙন দেখা দিয়েছে সেখানে বাঁধ উঁচু আছে। যদি ভাঙন বাড়ে, তাতে সমস্যা হবে না।