
দৃশ্যপটে এক শিশু—ছোট্ট একটি ঘরে বসে তার বাবার পুরনো স্মার্টফোনে ক্লাস করছে। পাশের ঘরে তার মা ইউটিউবে রান্নার রেসিপি খুঁজছেন, বাবা ব্যস্ত ফুড ডেলিভারির অর্ডার দিতে। বাইরের বারান্দায় ইন্টারনেট না থাকায় পাশের বাসার ছেলের মুখ ঝুলে আছে, কারণ সে গেম খেলতে পারছে না।
এই দৃশ্য আজ আমাদের ঘরে ঘরে। আমরা বলি, এগিয়ে যাচ্ছি—”স্মার্ট বাংলাদেশ” নির্মাণের পথে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা সত্যিই কি ‘স্মার্ট’ হচ্ছি? নাকি প্রযুক্তির ঝলকে এক ‘স্মার্ট বিভ্রান্তি’র দিকে হাঁটছি?
“স্মার্ট বাংলাদেশ”—এ এক ঝকঝকে স্লোগান।
ডিজিটাল লেনদেন, অনলাইন শিক্ষা, মোবাইল অ্যাপস নির্ভর স্বাস্থ্যসেবা, মেশিনভিত্তিক প্রশাসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবই যেন স্বপ্নের মতো। কিন্তু স্বপ্ন তখনই মধুর, যখন তার ভিত মজবুত। বাস্তবতা হলো, গ্রামের একটি প্রাইমারি স্কুলে আজও বিদ্যুৎ থাকে না পুরোদিন, শিক্ষক নেই প্রয়োজনমতো, শিশুরা জানে না ‘ই’ মানে কী। তারা কীভাবে হবে স্মার্ট?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪৫% পরিবারের ইন্টারনেট ব্যবহার সীমিত বা অনুপযুক্ত। অনলাইনে সুবিধা পাচ্ছে শহর—কিন্তু গ্রামের ছেলে-মেয়েদের জন্য প্রযুক্তির অর্থ এখনো প্রায় ‘অসাধ্য’। প্রযুক্তির ক্ষমতা যারা ধরতে পারছে, তারাই লাভবান—অন্যরা থেকে যাচ্ছে পিছনে, বিভ্রান্তির গর্তে।
আরেক দিকে, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা সমাজে এক নতুন সংকটও তৈরি করছে। তথ্য নিরাপত্তাহীনতা, ভুয়া খবরের বিস্তার, কিশোরদের মধ্যে ভার্চুয়াল আসক্তি—এসবের জন্য কী প্রস্তুত আমরা? সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে চলেছে তরুণদের মধ্যে। কিন্তু এসব বাস্তবতা নিয়ে কারো ভাবনা নেই, কারণ আমরা “স্মার্ট” হতে ব্যস্ত।
শিক্ষা ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে ডিজিটালাইজেশন হচ্ছে—কিন্তু সেই শিক্ষা কি সত্যিকারের মানোন্নয়ন আনছে, নাকি শুধু অ্যাপ-নির্ভর পঠনের নামে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ-ভাঙা সময়ের বলি বানাচ্ছে?
এই স্মার্ট বাংলাদেশে অনলাইন ফর্ম পূরণ না করতে পারা একজন কৃষক যখন অফিস থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তখন সে বুঝতে পারে—এই ডিজিটাল স্বপ্ন তার জন্য নয়।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই যাত্রা কি সবার জন্য? নাকি কিছু সুবিধাভোগীর স্মার্ট উল্লাসের আড়ালে এক শ্রেণি মানুষ চিরকাল পিছিয়েই থাকবে?
আমরা চাই উন্নয়ন, চাই প্রযুক্তি, চাই আধুনিকতা—কিন্তু তা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক আর সচেতন। প্রযুক্তির হাত ধরে আমরা যেন বিভ্রান্তির পথে না যাই, বরং হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সত্যিকারের “স্মার্ট বাংলাদেশ” গড়ি।
নইলে ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবেই—
স্মার্ট দেশ গড়েছিলে, কিন্তু সেই দেশের মানুষ কেমন ছিল? মানুষ ছিল তো?
লেখক,শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো,মিশর