
বিশ্বের বৃহত্তম গ্রামখ্যাত বানিয়াচংয়ের গর্বিত সন্তান, প্রজ্ঞা, সংগ্রাম ও সাফল্যের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি শেখ ফজলে এলাহীর ৭৭তম জন্মদিন আজ। জীবনের দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি পথ পেরিয়ে তিনি আজ দাঁড়িয়ে আছেন এক পরিপূর্ণতা ও তৃপ্তির অনন্য উচ্চতায়—যেখানে প্রতিটি স্মৃতি যেন ইতিহাসের একেকটি জীবন্ত অধ্যায়।
১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বানিয়াচংয়ের দেওয়ান দিঘির পূর্বপাড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মরহুম ইউছুফ আলির সন্তান শেখ ফজলে এলাহী, স্থানীয়দের কাছে ‘বাচ্চু ম্যাজিস্ট্রেট’ নামেই অধিক পরিচিত। শৈশবের সরলতা থেকে শুরু করে জীবনের কঠিন বাস্তবতা—সবকিছুকে আপন শক্তিতে জয় করে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।
তাঁর জীবন কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়, বরং একটি সময়ের ইতিহাসেরও প্রতিচ্ছবি। ১৯৫৬, ১৯৫৭ ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের নির্মম অভিজ্ঞতা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি—সবকিছুই তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রত্যক্ষ করাকে তিনি মনে করেন জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।
রাজনীতি, প্রশাসন ও পেশাগত জীবনে তাঁর রয়েছে বর্ণাঢ্য পদচারণা। ১৯৬৯ সালের ১১ দফা আন্দোলনে জেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব, তরুণ বয়সে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ, আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৮৩ সালে বিসিএস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ—প্রতিটি ধাপই তাঁর দৃঢ়তা ও মেধার সাক্ষ্য বহন করে। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এডিসি, ডিসি, বেতারের মহাপরিচালকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ২০০৬ সালে উপ-সচিব পদে থাকাবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন।
চাকরি জীবনের পাশাপাশি সাহিত্য, গবেষণা ও সাংবাদিকতায়ও তিনি রেখে চলেছেন অনন্য অবদান। অবসর-পরবর্তী সময়ে তিনি মনোনিবেশ করেন লেখালেখি ও গবেষণায়। তাঁর রচিত ‘বানিয়াচং বৃত্তান্ত’, ‘মুক্তিযুদ্ধে বানিয়াচং’, ‘মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ জেলা’, ‘আন্তর্জাতিক নদী আইন ও বাংলাদেশ-ভারত পানি বিরোধ’, ‘হ্যালো কমরেড’সহ একাধিক গ্রন্থ ইতোমধ্যে পাঠকসমাজে সমাদৃত হয়েছে। সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন পরিপূর্ণ মানুষ। তাঁর স্ত্রী মোতাহারা বেগম একজন সুনামধন্য চিকিৎসক এবং তাঁর তিন কন্যা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। পরিবারের এই সাফল্য তাঁর জীবনের ত্যাগ ও আদর্শেরই প্রতিফলন।
ভ্রমণপিপাসু এই মানুষটি জাপান, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মানবজীবনের বৈচিত্র্য তাঁকে দিয়েছে গভীর উপলব্ধি, যা তাঁর লেখনীতে প্রতিফলিত হয়েছে বারবার।
জীবনের এই প্রান্তে এসে তাঁর নেই কোনো আক্ষেপ, নেই কোনো অপূর্ণতা। বরং রয়েছে গভীর কৃতজ্ঞতা, শান্তি এবং মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার অদম্য প্রত্যয়। জন্মদিন উপলক্ষে তিনি সকলের কাছে দোয়া কামনা করেছেন—যেন সুস্থতা ও মানবসেবার পথে অবিচল থেকে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত মানুষের পাশে থাকতে পারেন।
বানিয়াচংয়ের এই কৃতি সন্তানের জন্মদিনে রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, গভীর শ্রদ্ধা ও দীর্ঘায়ু কামনা।