
সৌদি আরবের রিয়াদে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের দুই প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে এখনো রাষ্ট্রীয় কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর দীর্ঘ সাত দিন অতিবাহিত হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় নিহতদের মরদেহ প্রবাসেই পড়ে রয়েছে। এ নিয়ে নিহতের স্বজন ও স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর হতাশা দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে কষ্টের ও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নিজের নির্বাচনী এলাকার দুটি পরিবারে এমন ভয়াবহ শোকের মাতম চললেও স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বর্তমান সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী জনাব আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষ থেকে কোনো সহানুভূতি বা কার্যকর তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি। এলাকাবাসী অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, গতকাল মন্ত্রী মহোদয় কোম্পানীগঞ্জ সফরে এসে একটি খেলার মাঠ পরিদর্শন করলেও, মাত্র সামান্য দূরুত্বে অবস্থিত নিহতদের নিজ বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর সাথে দেখা পর্যন্ত করেননি। নিজের আসনের অসহায় মানুষের প্রতি মন্ত্রীর এমন বিমুখ আচরণকে চরম অবহেলা ও উদাসীনতা হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
এদিকে, গত ৮ জুলাই ‘প্রতিদিনের সিলেট’ নামক একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ওই সংবাদে দাবি করা হয়েছিল যে, সরকারি উদ্যোগে নাকি নিহত দুই প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিহতদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনরা এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্বজনদের অভিযোগ, বাস্তবে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। এই ধরনের ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ করে শোকাহত পরিবারগুলোর মানসিক কষ্টকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নিহত প্রবাসীদের বাড়িতে এখন চলছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের অবিরাম কান্নায় চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নিহতের স্ত্রী বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন, বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানের অকাল মৃত্যুর শোকে পাথর হয়ে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এমন এক চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে শোকগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে সরকারি এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করা, সিল-স্বাক্ষর সংগ্রহ করা কিংবা কাগজপত্রের পেছনে ছুটে বেড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই কঠিন সময়ে আমলাতান্ত্রিক সব জটিলতা দূর করে রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের স্বউদ্যোগে অসহায় পরিবার দুটির পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল বলে মনে করেন সচেতন মহল।
উল্লেখ্য, জনাব আরিফুল হক চৌধুরী অতীতে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সিলেট নগরীর সার্বিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। তার সেই বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও জনসম্পৃক্ততার প্রতি গভীর আস্থা রেখেই কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরের মানুষ তাকে সিলেট-৪ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছিলেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল— তিনি এই অঞ্চলকেও সিলেট সিটির মতোই নিবিড় যত্ন, উন্নয়ন ও অভিভাবকত্বে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মন্ত্রীর এমন নির্লিপ্ততা ভোটারদের দারুণভাবে আশাহত করেছে।
এলাকাবাসী ও সাধারণ মানুষের বক্তব্য, মন্ত্রী হিসেবে উনার রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততা অনেক, যা আমরা বুঝি। তবে জনগণ সবসময় যেকোনো দুর্যোগ ও বিপদের মুহূর্তে তাদের প্রতিনিধিকে কাছে পেতে চায়। তিনি সিলেটের মেয়র থাকাকালে যেভাবে মানুষের পাশে ছিলেন, ঠিক একইভাবে নিজ নির্বাচনী এলাকার এই অসহায় পরিবারগুলোর দুঃসময়ে অবহেলা না করে তাদের পাশে থেকে সহমর্মিতা জানানো খুব প্রয়োজন ছিল।
ভুক্তভোগী পরিবার এবং কোম্পানীগঞ্জের সাধারণ মানুষের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রবাসীরা নিজেদের রক্ত পানি করা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। তাই মৃত্যুর পর অন্তত তাদের মরদেহটা যেন সম্মানের সঙ্গে, দ্রুততম সময়ে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তারা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর আকুতি জানিয়েছেন।