
শিক্ষকরাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর। সেই শিক্ষক সমাজের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ রক্ষার নেতৃত্ব কার হাতে যাবে—এই প্রশ্নকে ঘিরে এখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে হবিগঞ্জের বানিয়াচং। বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি, বানিয়াচং উপজেলা শাখার ত্রি-বার্ষিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেষ মুহূর্তে সৃষ্টি হয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য, উৎসাহ আর টানটান উত্তেজনা। শিক্ষক সমাজের প্রতিটি আড্ডা, প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক কক্ষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন একটাই আলোচনা—কে হবেন আগামী দিনের অভিভাবক?
আগামী শনিবার (১লা আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মেধাবিকাশ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত এ নির্বাচন। উপজেলার ৪৩৩ জন শিক্ষক তাঁদের পবিত্র ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আগামী তিন বছরের জন্য বেছে নেবেন নিজেদের নেতৃত্ব।
এ নির্বাচন শুধুমাত্র কয়েকটি পদের দায়িত্ব বণ্টনের বিষয় নয়; এটি শিক্ষক সমাজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, পেশাগত মর্যাদা রক্ষা, ঐক্য সুদৃঢ় করা এবং আগামী দিনের শিক্ষা আন্দোলনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক আয়োজন। তাই ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কৌতূহল, উত্তেজনা ও প্রত্যাশা।
পাঁচটি পদের মধ্যে তিনটি পদে একক প্রার্থী থাকায় নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে তাদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেছে। তারা হলেন—যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে জুবায়ের আহমদ (নাগুড়া ফার্ম উচ্চ বিদ্যালয়), সাংগঠনিক সম্পাদক পদে মো. শাহিনুর মিয়া (আম বাগান উচ্চ বিদ্যালয়) এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সিরাজুল ইসলাম (একতা উচ্চ বিদ্যালয়)।
তবে নির্বাচনের সব উত্তাপ এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদকে ঘিরে।
সভাপতি পদে মুখোমুখি হয়েছেন দুইজন অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষক—মো. আবু তাহের (রত্না উচ্চ বিদ্যালয়) এবং আহসান হাবিব মানিক (ইকরাম নন্দপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়)। দীর্ঘদিনের শিক্ষা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতায় দু’জনই শিক্ষক সমাজে সুপরিচিত। ফলে এই পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস স্পষ্ট।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন প্রার্থী—শাব্বীর আহমদ শিবলী নোমানী (মহারত্নপাড়া এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়), মোফাজ্জল হোসেন মুকুল (আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়), মো. জাকির হোসেন (উত্তর সাঙ্গর উচ্চ বিদ্যালয়) এবং সেলিম তালুকদার (হানিফ খান দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়)। চার প্রার্থীর জোরালো প্রচারণায় নির্বাচনী মাঠ এখন সরগরম।
ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীরা ছুটে বেড়াচ্ছেন বিদ্যালয় থেকে বিদ্যালয়ে, শিক্ষক থেকে শিক্ষকের কাছে। করমর্দন, কুশল বিনিময়, মতবিনিময় আর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে মুখর হয়ে উঠেছে নির্বাচনী পরিবেশ। কেউ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন শিক্ষক সমাজের ন্যায্য দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নের, কেউ কল্যাণ তহবিলকে আরও শক্তিশালী করার, কেউ আবার শিক্ষক সমাজের ঐক্য ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করার অঙ্গীকার করছেন।
শিক্ষকদের ভাষ্য, “এই নির্বাচন ব্যক্তি জয়ের নয়, শিক্ষক সমাজের সম্মান ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের নির্বাচন।” তাই প্রতিটি ভোটই হয়ে উঠেছে অত্যন্ত মূল্যবান।
নির্বাচন কমিশনার আহমেদ ইমতিয়াজ বশির বলেন, “আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। শিক্ষক সমাজের গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।” তিনি নির্বাচন সফল করতে প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
এখন পুরো বানিয়াচংয়ের শিক্ষক সমাজের দৃষ্টি আগামী শনিবারের ব্যালট বাক্সে। উন্নয়ন, ঐক্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে যে নেতৃত্বের প্রত্যাশায় শিক্ষকরা ভোটকেন্দ্রে যাবেন, সেই প্রত্যাশার প্রতিফলনই নির্ধারণ করবে আগামী তিন বছরের সাংগঠনিক পথচলা। তাই শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় যতই উত্তাপ বাড়ুক, শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশা একটাই—সুস্থ, সুশৃঙ্খল ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন, যা আরও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষক সমাজ গঠনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।