
দীর্ঘ প্রায় তিন বছরের দায়িত্বপূর্ণ পথচলার পর মুনাজ্জমার দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছেন কাজী শামসুদ্দিন আল-আজহারী। ২০২৩ সালের শুরুতে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২৬ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন তিনি। গত ১ আগস্ট তাঁকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানো হয়।
দায়িত্বের সময়টুকু তাঁর কাছে ছিল কেবল একটি সাংগঠনিক পদে অবস্থান নয়; বরং বিদেশের মাটিতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর এক নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস। দায়িত্বের সীমারেখা পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, আবাসন, প্রশাসনিক জটিলতা ও মানবিক সংকটে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে তাঁর সময়কালটি অনেকের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দায়িত্ব পালনকালে প্রায় শতাধিক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কাজী শামসুদ্দিন আল-আজহারী। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশের অচেনা পরিবেশে উচ্চশিক্ষার পথ সহজ করতে তিনি ভর্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা সমাধানে সহযোগিতা করেছেন। একই সঙ্গে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর স্কলারশিপ ও আজহার হোস্টেল পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
শিক্ষার্থীদের সংকটের মুহূর্তেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সময়ে নির্দোষ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা গ্রেপ্তার বা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়লে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিষয়গুলো মোকাবিলা করে তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে তিনি ভূমিকা রাখেন। বিদেশের মাটিতে একজন শিক্ষার্থীর জন্য এমন সংকট শুধু আইনি বা প্রশাসনিক বিষয় নয়, অনেক সময় তা হয়ে ওঠে পরিবার থেকে দূরে থাকা একটি তরুণ জীবনের গভীর উদ্বেগের কারণ। সেই জায়গায় পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতাও তাঁর দায়িত্বকালকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
শুধু প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার পরিসর আরও বিস্তৃত করতে ‘মারকাজুস সুন্নাহ একাডেমি’র মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দারস ও তাদরিসের আয়োজন করেন। ইলমের পরিবেশকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ইলমি পরিবেশে জিয়ারতের ব্যবস্থাও করেন। ফলে শিক্ষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক আরও গভীর করার একটি ধারাও তাঁর সময়ে গড়ে ওঠে।
তাঁর দায়িত্বকালের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করা। বাংলাদেশে অনার্স সম্পন্ন করার পর যেন শিক্ষার্থীরা সরাসরি আল-আজহারে মাস্টার্স পর্যায়ে অধ্যয়নের সুযোগ পেতে পারেন—এমন একটি সুযোগ তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এটি উচ্চশিক্ষার পরিসর বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে তাঁর কাজের পরিধি কেবল মুনাজ্জমার দায়িত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইত্তিহাদ, গাউসিয়া কমিটি, আহলে সুন্নাত, নুসরা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি সাংগঠনিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিভিন্ন প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার যে ধারাটি দায়িত্বকালীন সময়ে গড়ে উঠেছিল, দায়িত্ব থেকে বিদায়ের পরও তা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
একজন দায়িত্বশীলের বিদায় কখনো শুধু একটি পদ থেকে সরে দাঁড়ানো নয়; কখনো তা একটি সময়ের সমাপ্তি এবং আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা। কাজী শামসুদ্দিন আল-আজহারীর ক্ষেত্রেও বিদায়টি তেমনই। ২০২৩ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন, পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব হস্তান্তর এবং ২০২৬ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিক বিদায়—এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর রেখে যাওয়া কাজের স্মৃতি এখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার অংশ।
বিদায়ের মুহূর্তে পদটি থেকে তিনি সরে দাঁড়ালেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের জায়গাটি যে শেষ হচ্ছে না, সেটিই তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক পরিসর শেষ হলেও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় তাঁর নিজের ভাষাতেও স্পষ্ট।
কাজী শামসুদ্দিন আল-আজহারীর দায়িত্বকাল তাই কেবল সময়ের হিসাব নয়; এটি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, আবাসন, মানবিক সহায়তা ও সাংগঠনিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অধ্যায়ের নাম। আনুষ্ঠানিক বিদায়ের পর সেই অধ্যায় শেষ হলেও তাঁর রেখে যাওয়া উদ্যোগ ও স্মৃতিগুলো সংশ্লিষ্টদের পথচলায় আরও দীর্ঘ সময় ধরে আলো ছড়াবে এমনটাই প্রত্যাশা শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের।