
সরকারি সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও তথ্যের অভাব, জটিল প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতির কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নাগরিকদের সমস্যা ও উদ্বেগ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সরকারি পদক্ষেপের অগ্রগতি জনগণকে জানানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ‘কণ্ঠস্বর থেকে কার্যকর পদক্ষেপ: জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় শাসনের জন্য নাগরিক-সরকার রিপোর্টিং ব্যবস্থা’ শীর্ষক পরামর্শমূলক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
কর্মশালায় ডিনেটের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদ হাসান, ‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক আসিফ আহমেদ তন্ময়, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সুয়েব হোসেন চৌধুরী এবং যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা অসীম কুমার কর বক্তব্য দেন।
এতে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের সংগঠন (সিএসও), কমিউনিটি-বেইজড সংগঠন (সিবিও), ডিনেটের কর্মকর্তা ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
প্রান্তিক মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত
আলোচনায় বক্তারা বলেন, সামাজিক সুরক্ষা, জীবিকা, জলবায়ু-সহনশীলতা ও দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি ও সেবা রয়েছে। তবে নারী, চা-শ্রমিক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ক্ষুদ্র কৃষক ও যুবসমাজসহ প্রান্তিক নাগরিকদের অনেকে এসব সেবার সুযোগ নিতে পারছেন না।
তথ্যের ঘাটতি, জটিল প্রক্রিয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছাতে না পারাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তাঁরা।
বক্তারা বলেন, সরকারি কোনো সেবা থাকা এবং সেই সেবায় নাগরিকের বাস্তব প্রবেশাধিকার পাওয়া এক বিষয় নয়। তাই শুধু সেবা চালু রাখলেই হবে না; প্রান্তিক মানুষের কাছে তা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
নাগরিকের অভিযোগের পরিণতি জানানো জরুরি
কর্মশালায় বলা হয়, নাগরিকের সমস্যা বা অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সেটির পরবর্তী অগ্রগতিও নাগরিককে জানানো প্রয়োজন। এতে সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি শক্তিশালী হবে।
ডিনেটের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদ হাসান বলেন, “মৌলভীবাজারে মানুষের কথা বলার জন্য শুধু আরেকটি ব্যবস্থা প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন এমন একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মানুষের কথা শোনা হবে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত হবে, সাড়া পাওয়া যাবে এবং ফলাফল সম্পর্কে মানুষকে জানানো হবে।”
সিএসও-সিবিওকে সেতুবন্ধন হিসেবে দেখার আহ্বান
কর্মশালায় স্থানীয় সিএসও ও সিবিওগুলোর ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, মাঠপর্যায়ে নাগরিকের সমস্যা ও প্রয়োজন শুনে তা নথিভুক্ত করা, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তুলে ধরা এবং সরকারি পদক্ষেপের অগ্রগতি অনুসরণে এসব সংগঠন সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে।
‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক আসিফ আহমেদ তন্ময় বলেন, “প্রান্তিক মানুষের অনেক সমস্যা ও প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে উঠে আসছে। এখন প্রয়োজন এসব বিষয়কে একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রতিক্রিয়া জনগণকে জানানো।”
নতুন কমিটি নয়, বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কার্যকর করার লক্ষ্য
কর্মশালায় স্পষ্ট করা হয়, এ উদ্যোগের লক্ষ্য নতুন কোনো কমিটি বা সমান্তরাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করা নয়। বরং বিদ্যমান সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সেবা ব্যবস্থাকে জনগণের কাছে আরও সহজপ্রাপ্য, সাড়াদানকারী ও জবাবদিহিমূলক করে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।
উল্লেখ্য, ‘নাগরিকতা—সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ)’ কর্মসূচির আওতায় মৌলভীবাজারে ‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। সুইজারল্যান্ড, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং জিএফএ কনসাল্টিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় ডিনেটের সঙ্গে সহযোগী সংস্থা প্রগতি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (PSUS), জন কল্যাণ কেন্দ্র (JKK), নিঃস্ব সহায়ক সংস্থা (NSS) ও প্রচেষ্টা (Procheshta) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।